বড় প্রকল্প,জাতীয় আয় বৃদ্ধির পরিসংখ্যানের পাশাপাশি পাশাপাশি খাদ্য,বাসস্থান,চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহণের খরচ দিয়ে উন্নয়নকে বিচার করা জরুরি
বিপ্লব চক্রবর্তী:উন্নয়ন হচ্ছে—এই কথা আমরা প্রায়ই শুনি। কোথাও নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে, কোথাও উড়ালপুল, শিল্পকারখানা কিংবা বড় বড় প্রকল্পের উদ্বোধন হচ্ছে। দেশের অর্থনীতি কতটা এগোল, জাতীয় আয় কতটা বাড়ল, কত নতুন প্রকল্প তৈরি হল—এসব হিসাবও সামনে আসে। কিন্তু এই উন্নয়নের ছবি দেখতে দেখতে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, সাধারণ মানুষের সংসারে কি সত্যিই স্বস্তি ফিরছে?
একজন সাধারণ মানুষের কাছে উন্নয়নের অর্থ খুব সহজ। মাসের শেষে সংসার চালাতে গিয়ে তাঁকে যেন ধার করতে না হয়। বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে গিয়ে বারবার দাম হিসাব করতে না হয়। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, পরিবারের চিকিৎসা এবং বাড়িভাড়া মেটানোর পরেও হাতে কিছু টাকা থাকে। এটাই তাঁর কাছে উন্নয়নের বাস্তব চেহারা।
কিন্তু বাস্তবে অনেক পরিবারের কাছে সংসার চালানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। খাবার, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, যাতায়াত, ওষুধ এবং পড়াশোনার খরচ মেটাতে গিয়ে মাসিক আয়ের বড় অংশ শেষ হয়ে যায়। যাঁদের আয় নিয়মিত বাড়ছে না, তাঁদের কাছে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও বড় চাপ তৈরি করে। তখন বড় রাস্তা বা নতুন প্রকল্পের খবর শুনেও সংসারের চিন্তা দূর হয় না।
অবশ্য বড় পরিকাঠামো তৈরি করা বা দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করা অপ্রয়োজনীয় নয়। উন্নয়নের জন্য এগুলির দরকার রয়েছে। নতুন শিল্প তৈরি হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে, ভালো রাস্তা হলে যাতায়াত সহজ হয়, আর উন্নত পরিকাঠামো ব্যবসা-বাণিজ্যেও সাহায্য করে। কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল কতটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে, সেটাই আসল প্রশ্ন।
দেশের অর্থনীতি বাড়লেই প্রত্যেক পরিবারের আয় একই হারে বাড়বে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। কারও হাতে নতুন কাজ আসছে, আবার কেউ কাজের খোঁজে ঘুরছেন। কোথাও উন্নত হাসপাতাল তৈরি হচ্ছে, অথচ অনেক পরিবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে সঞ্চয় ভেঙে ফেলছে। শিক্ষার সুযোগ বাড়লেও ভালো শিক্ষার খরচ অনেকের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
তাই উন্নয়নের হিসাব করতে গেলে শুধু বড় প্রকল্প বা অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দেখলে চলবে না। দেখতে হবে, কত মানুষের স্থায়ী কাজ হয়েছে, চিকিৎসা কতটা সহজলভ্য হয়েছে, শিক্ষার খরচ কতটা নাগালের মধ্যে রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে কি না।
সরকারের কাজ শুধু উন্নয়নের ঘোষণা দেওয়া নয়, সেই উন্নয়নের সুফল মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়াও। একইভাবে নাগরিকদেরও উন্নয়নের দাবি ও বাস্তব ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত উন্নয়নের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা কোনও পরিসংখ্যান নয়, মানুষের জীবন কতটা সহজ হল,সেটাই। যে উন্নয়নে সাধারণ মানুষ সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হতে পারেন এবং অসুস্থ হলে চিকিৎসার চিন্তায় দিশাহারা হন না, সেই উন্নয়নই প্রকৃত অর্থে সার্থক। কারণ দেশের অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হয়,যখন তার ছোঁয়া পৌঁছয় সাধারণ মানুষের সংসারেও।
