মোদি-বিরোধী রাজনীতিতে কি তৈরি হচ্ছে নতুন সমীকরণ? বাম, কংগ্রেস ও তৃণমূলের সম্ভাব্য নৈকট্য ঘিরে জাতীয় ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাড়ছে জল্পনা।
দিলীপ চট্টোপাধ্যায়, মানুষের মতামত:রাজনীতির বাতাস কখন কীভাবে দিক পরিবর্তন করে, তা আগে থেকে আঁচ করা কঠিন। কিন্তু সাম্প্রতিক জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে যে দ্রুত পরিবর্তনগুলো ঘটে চলেছে, তা স্পষ্ট নির্দেশ করছে—আগামী দিনগুলোতে এক উত্তাল রাজনৈতিক পর্বের মুখোমুখি হতে চলেছে দেশ। মোদি সরকারের বিরোধী শিবিরের প্রতিরোধ এবার আর কেবল সংসদীয় আলোচনার চেনা গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; রাজপথ থেকে সামাজিক মাধ্যম—সর্বত্র এক অভূতপূর্ব গতিশীলতা তৈরি হয়েছে।এই নতুন রাজনৈতিক কৌশলের ভরকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘ইন্ডিয়া’ জোট, নাগরিক সমাজ এবং তরুণ প্রজন্মের ‘জেন জি’ (Gen Z)। নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে আন্দোলন দানা বেঁধেছে। এই পদত্যাগের দাবি স্রেফ একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাতন্ত্র্য ও নিরপেক্ষতা রক্ষার লড়াই হিসেবে এটিকে তুলে ধরছে বিরোধী নেতৃত্ব। ছাত্র ও তরুণ প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা ও তেজ, যা স্বাভাবিকভাবেই শাসকদলের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে জাতীয় রাজনীতির এই ঝোড়ো হাওয়ার সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভূখণ্ডে। নবান্নের ক্ষমতা হস্তান্তর এবং রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে স্থানীয় রাজনৈতিক মেরুকরণ এক অভূতপূর্ব বাঁক নিয়েছে। বহু দশক ধরে যে দলগুলো আদর্শগত ও কৌশলগতভাবে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাজনীতি করেছে, আজ সময়ের প্রয়োজনে এবং এক সাধারণ ‘রাজনৈতিক শত্রু’র মুখোমুখি হয়ে তারা স্পষ্টতই কাছাকাছি আসতে শুরু করেছে।দীর্ঘদিনের বৈরিতা ভুলে বাম-কাস্তে-হাত আর জোড়াফুলের সমীকরণ এখন এক অদ্ভুত নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। বিজেপিকে প্রতিহত করতে একদিকে সিপিআই(এম)-এর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট, অন্যদিকে সিপিআই(এম-এল) লিবারেশন বা এসইউসিআই-এর মতো অতি-বামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেসের দূরত্ব ক্রমশ কমছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রাজ্যে প্রশাসনিক শক্তি হিসেবে বিজেপির উত্থান এই সমস্ত বিরোধী শিবিরের সামনে এক ‘অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন’ দাঁড় করিয়েছে। ফলে আদর্শগত সংঘাতের চেয়ে রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকট এখন তাদের কাছে বড় হয়ে উঠেছে।
অবশ্য এই ‘মহাজোট’ বা নৈকট্য কেবল শীর্ষ নেতাদের আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নিচুতলার কর্মী-সমর্থকদের মন জয় করতে পারবে—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ তিল তিল করে গড়ে ওঠা বহু বছরের রাজনৈতিক লড়াইয়ের অতীতকে রাতারাতি মুছে ফেলা সহজ নয়। তৃণমূল ও বামপন্থী দলগুলোর কর্মীস্তরের অম্লমধুর সম্পর্ক এই প্রক্রিয়ার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।তা সত্ত্বেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের গণদাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জাতীয় আন্দোলন এবং পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধীদের এই আকস্মিক মেরুকরণ—সব মিলিয়ে এক বিরাট পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। আদর্শগত পার্থক্য সরিয়ে রেখে এই সম্ভাব্য প্ল্যাটফর্ম কি পারবে দেশের রাজনীতিতে বিজেপি-বিরোধী নতুন কোনও শক্তি বা বিকল্প দিশা তৈরি করতে? উত্তর দেবে সময়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে—আগামীর রাজনীতি হতে চলেছে অত্যন্ত তীব্র, জটিল ও নাটকীয়।
