শিল্প থেকে বন্দর, রাস্তা থেকে রেল— একের পর এক বড় সিদ্ধান্ত, তবু আলোচনায় কেন শুধু নেতিবাচক খবর? প্রফুল্ল সেনের পর শুভেন্দুকেও কি একইভাবে কাঠগড়ায় তোলার চেষ্টা?

নাজমুল হাসান,মানুষের মতামত: সরকার কতটা কাজ করছে এবং সেই কাজের খবর সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছচ্ছে— পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এখন এই প্রশ্নই সামনে আসছে। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকারের সমর্থকদের একাংশের অভিযোগ, শিল্প, পরিকাঠামো, কর্মসংস্থান ও নারীকল্যাণে একের পর এক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সংবাদমাধ্যমে তার তুলনায় নেতিবাচক ঘটনাই বেশি জায়গা পাচ্ছে।
সরকারপক্ষের দাবি, অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ শুরু হয়েছে। বন্ধ পাটকল পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা, নতুন ইস্পাত প্রকল্প, দুগ্ধশিল্পে বিনিয়োগ, জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণ, পুরুলিয়ায় পরিশ্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা, নতুন বিমানবন্দর পরিকল্পনা এবং জলপথ ও বন্দর পরিকাঠামো উন্নয়নের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি দুর্গাপুর ও শিলিগুড়িতে মেট্রো যোগাযোগের পরিকল্পনা, পণ্যবাহী রেল করিডোর এবং গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরির উদ্যোগকেও ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার। শাসক শিবিরের বক্তব্য, এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে বাংলার শিল্প ও বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সামাজিক ক্ষেত্রেও একাধিক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরছে সরকার। মহিলাদের জন্য আর্থিক সহায়তা, সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, প্রশাসনে মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি এবং বিশ্বের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া মেধাবী পড়ুয়াদের আর্থিক সাহায্যের মতো সিদ্ধান্তকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। গবেষণা, উচ্চশিক্ষা এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ টানতে GCC নীতি তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে দাবি।
আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও কড়া অবস্থানের কথা বলছে সরকার। তোলাবাজি, কাটমানি এবং অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর পাশাপাশি দাগি অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সরকারের দাবি, পুলিশ ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নতুন আত্মবিশ্বাস এসেছে। স্কুলে ছাত্রছাত্রী ফেরানো থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত প্রশাসনে সংস্কার— তৃণমূল স্তরেও পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে।
বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর এবং পূর্ব ভারতের নতুন বাণিজ্য করিডোরকে। সরকারের মতে, এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে বাংলার বন্দরভিত্তিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে পণ্য পরিবহণের নতুন পথও খুলে যেতে পারে।
শুধু উন্নয়ন নয়, শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত জনসমর্থন নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। বৃহত্তর হিন্দু সমাজের পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় মুসলিম সমাজের একটি অংশও তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল বা অনুগামী বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে খুব বেশি দেখা না গেলেও, নীরব এই সমর্থন ভবিষ্যতের নির্বাচনী সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।
এই পরিস্থিতিতেই সামনে আসছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের প্রসঙ্গ। সরকারের সমর্থকদের একাংশের বক্তব্য, এক সময় তাঁর সরকারের বিভিন্ন কাজের তুলনায় নেতিবাচক প্রচার বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল এবং তার প্রভাব তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তির উপর পড়েছিল। শুভেন্দু অধিকারীর ক্ষেত্রেও কি একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে— সেই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক মহলের একাংশে উঠছে।
সরকারের সামনে তাই দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, উন্নয়নের কাজের গতি ধরে রাখা। দ্বিতীয়ত, সেই কাজের খবর সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কারণ রাজনীতিতে শুধু কাজ করাই যথেষ্ট নয়, মানুষকে সেই কাজ সম্পর্কে জানানোও জরুরি। আগামী দিনে সেই প্রচারের লড়াইটাই শুভেন্দু সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
