NewsPolitics

মোহন ভাগবতের সফরের পর চাঙ্গা বিজেপি দিল্লি মডেলেই বাংলা দখলের ছক?

নিজস্ব প্রতিবেদক,মানুষের মতামত:পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে এবং ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে এগোতে চাইছে গেরুয়া শিবির।সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সর সংঘচালক মোহন ভাগবতের দশদিনের বঙ্গ সফরের পর থেকেই নতুন উদ্যমে মাঠে নেমেছে রাজ্য বিজেপি। দলীয় নেতৃত্বের মতে, ভাগবতের সফর বিজেপির কর্মীদের মনোবল বাড়িয়েছে এবং বিজেপির দীর্ঘমেয়াদি সংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

এদিকে, বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার এবং বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দিল্লিতে ভোটের প্রচারে গিয়ে সেখানকার নির্বাচনী কৌশল দেখে উচ্ছ্বসিত । সেই কৌশল নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তাঁরা । যেভাবে কেজরিওয়াল সরকারের লিকার দুর্নীতি থেকে মুখ্যমন্ত্রীর জন্য শিসমহল নির্মাণ নিয়ে অভিযোগের কথা তুলে ধরে দিল্লির ভোটারদের মন ঘোরাতে সক্ষম হয়েছেন । তাতে সেই কৌশল পশ্চিমবঙ্গের আঙ্গিকে ব‍্যবহার করে রাজনৈতিক লাভ করা যেতেই পারে। কারণ, গত ১৪ বছরে তৃণমূল জমানায় দুর্নীতির ঘটনার অভাব নেই। তাই জানা গেছে, দিল্লি মডেলকে মাথায় রেখেই এবার বাংলা দখলের রণকৌশল সাজাতে চাইছে বিজেপি। দিল্লিতে বিজেপি যেভাবে আম আদমি পার্টির বিরুদ্ধে লড়াই করে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে, সেই একই ছক বাংলায় প্রয়োগ করতে চায় বঙ্গ বিজেপি।

দিল্লি মডেলেই বাংলা দখলের স্বপ্ন

দিল্লিতে একসময় অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে আম আদমি পার্টি বিজেপিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কেজরিওয়াল এবং তাঁর দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও অন্যান্য ইস্যু তুলে ধরে বিজেপি সেখানে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করেছে। ২০১৫ সালে ৬৭ এবং ২০২০ সালে ৬২ আসন জেতা আপ মাত্র ২২টি আসনে নেমে এসেছে । পরাজয় হয়েছে কেজরিওয়াল সহ তার মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যের । বাংলার বিজেপি নেতৃত্ব মনে করছে, পশ্চিমবঙ্গে ঠিক একই ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

রাজ্যের বর্তমান শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস টানা তিনবার ক্ষমতায় এসেছে, যার ফলে একদিক থেকে সরকারের প্রতি ক্ষোভ বাড়ছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন শাসনে থাকার কারণে দুর্নীতির অভিযোগও উঠছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দিল্লির মতোই বাংলায় কৌশল নিতে চাইছে বিজেপি। তাদের পরিকল্পনা হল—

1. দুর্নীতি বিরোধী প্রচার: দিল্লির মতো বাংলাতেও শাসক দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে মূল হাতিয়ার বানানো হবে।

2. দুর্বল জায়গায় আঘাত: যেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে, সেসব এলাকায় বিজেপি শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করবে।

3. কেন্দ্রীয় এজেন্সির ভূমিকা: দুর্নীতি দমন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির (CBI, ED) তদন্তকে সামনে রাখা হতে পারে।

4. বিকল্প সরকার গঠনের বার্তা: জনগণের কাছে বিজেপিকে একটি শক্তিশালী বিকল্প সরকার হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।

মোহন ভাগবতের সফর ও সংঘের ভূমিকা

মোহন ভাগবতের সফর বিজেপির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। তাঁর সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল—

• পশ্চিমবঙ্গে সংঘের কার্যক্রম আরও মজবুত করা।

• হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে সামনে রেখে সংগঠনের প্রসার ঘটানো।

• বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বকে নতুন দিশা দেখানো।

আরএসএস সবসময় থেকেই বিজেপির আদর্শগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এসেছে। ভাগবতের সফরের পর বিজেপির বিভিন্ন শাখা সংগঠন আরও সক্রিয় হয়েছে, যা আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিজেপির চ্যালেঞ্জ

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি এক ঐতিহাসিক উত্থান ঘটালেও শেষ পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। বিজেপি ৭৭টি আসন পেলেও পরবর্তী সময়ে দলত্যাগ এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে তাদের শক্তি কিছুটা কমে যায়। তবে সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনের পর তিন রাজ্যের ফলাফল বিজেপির জয় আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।

হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র এবং দিল্লির মতো কঠিন রাজ্যে বিজেপির জিত নতুন করে শক্তি সঞ্চার করেছে। বাংলার বিজেপি নেতারা মনে করছেন, ঠিক একইভাবে এখানে সংগঠনকে শক্তিশালী করলে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভালো ফল করা সম্ভব।

তবে বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি দিল্লির থেকে আলাদা। এখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত জনপ্রিয় নেত্রী এবং তৃণমূলের ভোটব্যাংক বেশ দৃঢ়। বিজেপির চ্যালেঞ্জ হল—

• সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন দূর করা: বিজেপির রাজ্য ইউনিটে বিভাজন লক্ষ্য করা গেছে, যা সমাধান করা জরুরি।

• সংখ্যালঘু ভোটের সমর্থন নিশ্চিত করা: বাংলার মুসলিম ভোটারদের বড় অংশ তৃণমূলের সঙ্গে আছে, যা বিজেপির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

• আদিবাসী ও দলিত ভোট টানা: বিজেপির লক্ষ্য থাকবে আদিবাসী ও দলিত ভোট নিজেদের দিকে টানা।

দিল্লি মডেলে বাংলায় ভোটের লড়াই চালানোর পরিকল্পনা করলেও, বিজেপিকে রাজ্যের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এগোতে হবে। মোহন ভাগবতের সফরের পর বিজেপি যে নতুন উদ্যমে সংগঠনকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে, তা স্পষ্ট। তবে শুধু সংঘের আদর্শ নয়, বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী কৌশল নিতে হবে বিজেপিকে।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন বাংলার রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে, এবং বিজেপি যদি সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে, তাহলে তাদের জন্য সুযোগ থাকছে। এখন দেখার বিষয়, সংঘের সহযোগিতায় বিজেপি কতটা শক্তিশালী হতে পারে এবং তাদের কৌশল কতটা কার্যকর হয়।

 

Share with

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *