অজয় কুমারের দক্ষতায় সিলমোহর,মমতার আমলে উপেক্ষা,বিজেপি আমলে স্বীকৃতি-পদক তালিকায় দময়ন্তী-জয়রামন-কঙ্কর-অংশুমান!
নাজমুল হাসান,মানুষের মতামত:স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে রাজ্য পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকদের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর পদক ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। এবারের তালিকায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ নাম ডিজি (সদর) অজয় কুমার,আইপিএস। প্রশাসনিক মহলের বক্তব্য,বর্তমানে রাজ্য পুলিশের সদর দফতরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে সামলাচ্ছেন তিনি। নবান্ন ও ভবানী ভবনের একাধিক সূত্রের দাবি, পেশাদারিত্ব,প্রশাসনিক দক্ষতা এবং পুলিশবাহিনীর বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয় রক্ষার ক্ষেত্রে অজয় কুমারের ভূমিকা বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। সেই কারণেই ‘মুখ্যমন্ত্রীর অসাধারণ পরিষেবা পদক ২০২৬’-এর তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে একেবারে প্রথমে।
তবে শুধু অজয় কুমার নন,এবারের পদক-তালিকা ঘিরে পুলিশ ও প্রশাসনিক মহলে আলাদা রাজনৈতিক তাৎপর্যও দেখা যাচ্ছে। কারণ, অসাধারণ পরিষেবার জন্য মনোনীত একাধিক আইপিএস আধিকারিকের কর্মজীবনের একটা বড় সময় কেটেছে এমন পরিস্থিতিতে,যখন পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক খুব একটা মসৃণ ছিল না বলে প্রশাসনিক মহলে আলোচনা ছিল।
অসাধারণ পরিষেবার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর পদক পাচ্ছেন অজয় কুমারের পাশাপাশি নীরজ কুমার সিং,দময়ন্তী সেন,কে জয়রামন,প্রণব কুমার এবং কুণাল আগরওয়াল। এই তালিকায় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে দময়ন্তী সেন এবং কে জয়রামন-এর নাম। পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণ মামলার তদন্তে দময়ন্তী সেনের ভূমিকা একসময় রাজ্য রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিল। অন্যদিকে, কঠোর ও আপসহীন পুলিশ আধিকারিক হিসেবে পরিচিত কে জয়রামনের কর্মজীবনেও রয়েছে বহুচর্চিত প্রশাসনিক অধ্যায়।
২০১৩ সালে শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার থাকাকালীন শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি উন্নয়ন পর্ষদের দুর্নীতি মামলার তদন্তে নেমে তৎকালীন মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক তথা আইএএস অফিসার গোদালা কিরণ কুমারকে গ্রেফতার করেছিলেন জয়রামন। সেই ঘটনা রাজ্য প্রশাসনে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তীতে তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে বাধ্যতামূলক প্রতীক্ষায় পাঠানো হয়।
২০২৬ সালের নির্বাচন পর্বে উত্তরবঙ্গে সুকেশ কুমার জৈনের পরিবর্তে কে জয়রামনকে দায়িত্ব দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। পরে বিজেপি সরকার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির তদন্তের জন্য গঠিত কমিশনের সদস্য-সচিবের দায়িত্ব দেয় তাঁকে।
অন্যদিকে,’মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসনীয় পরিষেবা পদক ২০২৬’ পাচ্ছেন কঙ্কর প্রসাদ বারুই, সুনীল কুমার যাদব, রাঠোড় অমিতকুমার ভারত,সূর্য প্রতাপ যাদব, পুষ্পা,অংশুমান সাহা, সচিন মাক্কার এবং ড. অরবিন্দ কুমার আনন্দ।
তৃণমূল আমলের প্রথম দিকে প্রশাসনিকভাবে কিছুটা সামনের সারিতে থাকলেও পরবর্তী কয়েক বছর কার্যত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের বাইরে ছিলেন আইপিএস কঙ্কর প্রসাদ বারুই!পুলিশ মহলের একাংশের দাবি, বসিরহাটের পুলিশ সুপার থাকাকালীন জেলার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃত্বের কিছু অনৈতিক কার্যকলাপে বাধা দিতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সংঘাত তৈরি হয়েছিল। এর পরই তাঁকে আচমকা সরিয়ে কলকাতা পুলিশের ডিসি, এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ পদে পাঠানো হয়। পরে দীর্ঘ সময় তাঁকে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ টেলিকম শাখায় দায়িত্ব পালন করতে হয়।২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় পরিস্থিতি বদলায়। নির্বাচন কমিশন তাঁকে ডিআইজি, প্রেসিডেন্সি রেঞ্জ পদে দায়িত্ব দেয়। ভোটের পর পদোন্নতি পেয়ে তিনি আইজি পদমর্যাদায় প্রেসিডেন্সি রেঞ্জের দায়িত্বেই রয়েছেন।
সম্প্রতি বারুইপুরে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন রাজ্যজুড়ে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়, তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বারুইয়ের ভূমিকা প্রশাসনের নজর কেড়ে নেয়। উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা থেকে শুরু করে দ্রুত মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার—গোটা পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা নেন। পুলিশ প্রশাসনের অন্দরের খবর,তাঁর এই তৎপরতা পুলিশমন্ত্রীরও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
অন্যদিকে,আইপিএস অংশুমান সাহা-র কর্মজীবনেও রয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষার অধ্যায়।প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর তাঁকে তুলনামূলক গুরুত্বহীন পদে রাখা হয়েছিল বলে পুলিশ মহলে আলোচনা রয়েছে।প্রশাসনিক অন্দরের একাংশের দাবি,তৎকালীন রাজ্যের বিরোধী দলনেতার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের কারণেই তিনি একসময় ক্যামাক স্ট্রিটের বিরাগভাজন হয়েছিলেন।
পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন তাঁকে পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব দেয়। সূত্রের দাবি,সেই সময় দায়িত্ব পালনের পথে তাঁকে পূর্বতন শাসকদলের একাংশের নানা অসন্তোষ ও চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও দায়িত্বে অবিচল থেকে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করেন।ভোট-পরবর্তী সময়েও পূর্ব মেদিনীপুরে দায়িত্বে থেকে তিনি প্রশাসনিক দৃঢ়তা বজায় রেখেছেন। পুলিশ মহলের বক্তব্য,দীর্ঘদিন তুলনামূলক গুরুত্বহীন পদে থাকার পরও দায়িত্বে ফিরে এসে কর্তব্যনিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে যাওয়াই অংশুমান সাহার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে।
স্বাধীনতা দিবসের আগে প্রকাশিত এই তালিকা তাই নিছক পুলিশি সম্মানের ঘোষণা নয়; রাজ্য প্রশাসনের অন্দরে অতীতে উপেক্ষিত বা বিতর্কের মুখে পড়া কয়েকজন আধিকারিকের পুনর্মূল্যায়নের বার্তা হিসেবেও একে দেখছে পুলিশ মহলের একাংশ।
