শৃঙ্খলার নামে শিক্ষাঙ্গনে গেরুয়া নিয়ন্ত্রণ? শমীকের সাফাইয়ে থামছে না বিতর্ক!প্রতিশ্রুতি কোথায়?

নিজস্ব প্রতিবেদক, মানুষের মতামত: ক্ষমতায় এসে যে ব্যবস্থাকে ‘রাজনৈতিক প্রভাব’-এর প্রতীক বলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কয়েক মাসের মধ্যেই কি সেই পথেই হাঁটছে নতুন সরকার? রাজ্য সরকার পোষিত কলেজগুলির গভর্নিং বডি ভেঙে প্রশাসক বসানোর পর এবার একাধিক কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতি পদে বিজেপির সাংসদ ও বিধায়কদের বসানোর সিদ্ধান্ত ঘিরে সেই প্রশ্নই ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
রাজনৈতিক পালাবদলের পর সরকারের অন্যতম ঘোষণা ছিল শিক্ষাঙ্গনকে দলীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা। সেই যুক্তিতেই পুরনো গভর্নিং বডিগুলি ভেঙে প্রশাসকদের হাতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বার্তা ছিল স্পষ্ট— কলেজ পরিচালনায় রাজনৈতিক পরিচয়ের বদলে গুরুত্ব পাবে প্রশাসনিক দক্ষতা ও স্বচ্ছতা।
কিন্তু নতুন তালিকায় শাসকদলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নাম উঠে আসতেই সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবের ব্যবধান সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠছে, যাঁদের রাজনৈতিক পরিচয়ই তাঁদের প্রধান পরিচয়, তাঁদের কলেজ পরিচালনার সর্বোচ্চ পদে বসিয়ে শিক্ষাঙ্গনকে ‘রাজনীতিমুক্ত’ রাখার দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য?
রবিবার হাওড়ায় রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কলেজে রাজনৈতিক অশান্তি রোধ এবং শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতেই সচেতনভাবে জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অতীতে অধ্যাপক-অধ্যাপিকাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার-সহ নানা অশান্তির ঘটনা ঘটেছে, তার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোই নতুন সভাপতিদের দায়িত্ব বলে তাঁর দাবি।
কিন্তু এখানেই পাল্টা প্রশ্ন উঠছে— শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব কি প্রশাসন, পুলিশ ও কলেজ কর্তৃপক্ষের নয়? সেই কাজের জন্য শাসকদলের সাংসদ-বিধায়ককেই কেন প্রয়োজন? রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ঠেকাতে রাজনৈতিক ব্যক্তিকেই মাথায় বসানোর এই যুক্তি অনেকের কাছেই স্ববিরোধী বলে মনে হচ্ছে।
বাংলার শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাব অবশ্য নতুন নয়। বাম আমলে ‘অনিলায়ন’ নিয়ে যেমন অভিযোগ উঠেছিল, তৃণমূল জমানাতেও কলেজ পরিচালনা, ভর্তি থেকে ছাত্র রাজনীতি— সর্বত্র শাসকদলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধীরা সরব হয়েছে। বিজেপিও দীর্ঘদিন সেই ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেছে।
তাই ক্ষমতায় এসে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার যখন গভর্নিং বডি ভেঙেছিল, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান ঘটতে চলেছে। কিন্তু সাংসদ-বিধায়কদের ফের পরিচালন সমিতির শীর্ষে বসানোর সিদ্ধান্তে প্রশ্ন উঠছে— বদল কি শুধু দলের রঙে, নাকি ব্যবস্থাতেও?
ফলে লাল থেকে সবুজ, আর এখন গেরুয়া— ক্ষমতার রঙ বদলালেও শিক্ষাঙ্গনের পরিচালনায় রাজনৈতিক মুখের উপস্থিতির পরিচিত ছবিটাই কি শেষ পর্যন্ত থেকে যাচ্ছে? নতুন সিদ্ধান্তের পর সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নই এখন সরকারের সামনে।
