নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনের ফল ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতিতে নতুন আলোচনা। কংগ্রেস, তৃণমূল ও বামেদের ভোটের ফল, সংগঠন এবং বিজেপির বিরুদ্ধে বিকল্প নেতৃত্বের প্রশ্ন নিয়ে বিশ্লেষণ।
স্নেহাশীষ মুখার্জি, মানুষের মতামত:নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনের ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। দুই কেন্দ্রেই বিজেপির জয় যেমন রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয়, তেমনই বিরোধী দলগুলির ভোটের ফল, প্রার্থী নির্বাচন এবং সাংগঠনিক দুর্বলতাও সামনে এসেছে। বিশেষ করে বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আগামী দিনে কোন দল উঠে আসবে, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।নন্দীগ্রাম বিধানসভায় বিজেপির জয় প্রত্যাশিতই ছিল বলে মনে করেছিলেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ। কারণ এই কেন্দ্র থেকেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জয়ী হয়েছিলেন। ফলে উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী হাসি রাণী রথের বড় ব্যবধানে জয় নিয়ে বিশেষ সংশয় ছিল না। তবে নজর কেড়েছে দ্বিতীয় স্থানে কংগ্রেসের উঠে আসা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনকে পাশে নিয়ে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের ভোট উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। গত মে মাসের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী শেখ জারিয়াতুল হোসেন পেয়েছিলেন মাত্র ৭৯৪ ভোট। কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই ভোট বেড়ে ৪১ হাজারের বেশি হয়েছে। ফলে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটের একাংশকে এক জায়গায় আনার ক্ষেত্রে মমতা-সমর্থিত কংগ্রেস কতটা কার্যকর হতে পারে, সেই প্রশ্নও উঠছে। অন্য দিকে সিপিআই, আইএসএফ এবং গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।রেজিনগরের ফল আরও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় ৭০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটের এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী শাঁখারব সরকার ৭৩ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আমজনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী গোলাম নবী আজাদ। অথচ এক সময় মুর্শিদাবাদে শক্তিশালী বলে পরিচিত কংগ্রেস এবং তৃণমূলের প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। একই পরিণতি হয়েছে সিপিএম এবং গণতান্ত্রিক তৃণমূলের প্রার্থীদেরও।
দুই কেন্দ্রের ফলাফলেই বিরোধী শিবিরের সাংগঠনিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। প্রার্থী নির্বাচন, স্থানীয় স্তরে সংগঠন এবং ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা—এই তিন ক্ষেত্রেই বিরোধীদের নতুন করে ভাবতে হবে। শুধুমাত্র বিজেপি-বিরোধী ভোটকে একত্রিত করার কৌশল যথেষ্ট নয়, স্থানীয় সমস্যা এবং এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণকেও গুরুত্ব দিতে হবে।অনেকে মনে করেছিলেন, বিজেপির বিরুদ্ধে আগামী দিনে মতাদর্শগত রাজনীতির ভিত্তিতে বামেরা শক্তিশালী বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ফল সেই সম্ভাবনাকেও ধাক্কা দিয়েছে। দুই কেন্দ্রেই সিপিএমের ভোট কার্যত দেড় থেকে দুই শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করেছে। অর্থাৎ দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের স্মৃতি এখনও ভোটে প্রত্যাবর্তনের মতো প্রভাব ফেলতে পারেনি বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
ফলে উপনির্বাচনের ফলাফল শুধু দুটি আসনের জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়, বাংলার বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যতেরও ইঙ্গিত বহন করছে। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কংগ্রেস, তৃণমূল, বাম কিংবা অন্য কোনও দল—কে প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠবে, তার উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।আগামী দিনে সংগঠন পুনর্গঠন, বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব এবং স্থানীয় স্তরে ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচিই ঠিক করবে, বিজেপির মোকাবিলায় বাংলায় বিরোধী রাজনীতির মুখ কে হবে।
