পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা হারানোর পর জাতীয় রাজনীতিতে ইন্ডি জোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা, কংগ্রেস ও বামেদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বাংলায় সম্ভাব্য জোটের সমীকরণ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।
দীপঙ্কর মন্ডল,মানুষের মতামত:পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা হারানোর পর জাতীয় রাজনীতিতে ফের ইন্ডি জোটের পরিসরে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দিল্লিতে বিজেপি-বিরোধী শক্তিগুলির সঙ্গে এক মঞ্চে তাঁকে দেখা গেলেও, বাংলায় তাঁকে নিয়ে ইন্ডি জোটের শরিকদের একাংশের মধ্যে এখনও যে পুরোপুরি আস্থা তৈরি হয়নি, সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ক্ষমতায় থাকাকালীন যে কৌশল নিয়েছিলেন মমতা, তার জেরে রাজ্যে কংগ্রেস ও বামেদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা রাতারাতি মুছে যাওয়া কঠিন।
২০২৩ সালে বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে এক ছাতার তলায় আনার উদ্যোগ নেন বিহারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা জেডিইউ নেতা নীতীশ কুমার। সেই উদ্যোগ থেকেই পরবর্তীতে গড়ে ওঠে ইন্ডিয়া জোট। কংগ্রেস-সহ একাধিক বিরোধী দলের সঙ্গে সেই জোটে শামিল হয় তৃণমূলও। দিল্লির বৈঠকে বিজেপি-বিরোধী ঐক্যের বার্তা দিলেও, বাংলায় তার প্রতিফলন কতটা হয়েছিল, তা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল।বিশেষ করে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বাংলায় আসন সমঝোতা নিয়ে তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেস ও বামেদের সম্পর্ক কার্যত তলানিতে পৌঁছয়। রাজ্যে কংগ্রেস বা বামফ্রন্টকে কার্যত কোনও আসন ছাড়েনি তৃণমূল। উল্টে বহরমপুরে তৎকালীন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রার্থী করা হয় প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠানকে। গুজরাত থেকে পাঠানকে এনে বহরমপুরের মতো কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটিতে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। শেষ পর্যন্ত অধীরকে হারিয়ে জয় পান ইউসুফ।
শুধু কংগ্রেস নয়, বাংলার বামেদের সঙ্গেও মমতার রাজনৈতিক সংঘাত দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে সিপিএমের সঙ্গে তৃণমূলের বিরোধ রাজ্য রাজনীতিতে বহু পুরনো। সেই জায়গায় দাঁড়িয়েই এখন জাতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী বৃহত্তর সমীকরণে বামেদের সঙ্গে মমতার সম্ভাব্য সমন্বয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দিল্লিতে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির সঙ্গে মমতার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ছবি বা রাজনৈতিক যোগাযোগ সামনে এলেও, বাংলার সিপিএম নেতৃত্বের অবস্থান যে একই রকম, তা নয়।রাজ্য সিপিএমের বর্ষীয়ান নেতাদের একাংশের বক্তব্য, বিজেপিকে পরাজিত করার প্রশ্নে জাতীয় স্তরে যে কোনও বৃহত্তর সমীকরণ তৈরি হতে পারে, কিন্তু বাংলার বাস্তবতা আলাদা। বিমান বসু, মহম্মদ সেলিম-সহ রাজ্য বাম নেতৃত্বের একাংশ অতীতে তৃণমূলের বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন, তা থেকে হঠাৎ সরে এসে মমতাকে জোটসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করা কতটা সম্ভব, তা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। ফলে দিল্লির রাজনৈতিক মঞ্চে যে সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তা বাংলার মাটিতে কতটা কার্যকর হবে, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। জাতীয় স্তরে রাহুল গান্ধী বা প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরার সঙ্গে মমতার সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পর্কের ছবি সামনে এলেও, পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের বড় অংশের কাছে তৃণমূল এখনও প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতার পিছনে তৃণমূলের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছেন প্রদেশ কংগ্রেসের একাংশ। ফলে মমতার সঙ্গে সরাসরি জোটে যাওয়ার বিষয়ে বাংলার কংগ্রেসের মধ্যেই আপত্তি রয়েছে।এই পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজনীতিতে ইন্ডি জোটকে আঁকড়ে ধরে বিজেপি-বিরোধী পরিসরে নিজের জায়গা পুনর্গঠনের চেষ্টা করলেও, মমতাকে নিয়ে শরিক দলগুলির মধ্যে আস্থার প্রশ্ন পুরোপুরি মেটেনি বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাঁদের মতে, দিল্লিতে বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে সমঝোতা করা সম্ভব হলেও, বাংলায় আসন সমঝোতা, নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং তৃণমূলের সঙ্গে অতীতের সংঘাত—এই তিনটি বিষয়ই ইন্ডি জোটের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ফলে মমতার সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। এক দিকে বাংলায় ক্ষমতা হারানোর পর নিজের রাজনৈতিক পরিসর পুনর্গঠন, অন্য দিকে জাতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী জোটে নিজের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখা। ইন্ডি জোটের শরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করা গেলেও, সেই সম্পর্ক বাংলার মাটিতে কতটা ভোটের সমীকরণে পরিণত হবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। রাজনৈতিক মহলের নজর তাই দিল্লির মঞ্চের পাশাপাশি বাংলায় কংগ্রেস এবং বামেদের সঙ্গে মমতার সম্ভাব্য সমীকরণের দিকেও।
