শান্তনুদের ক্রাইসিস মিটিয়ে, আন্দোলনের মোকাবিলা করতে পারবে তৃণমূলের নতুন চিকিৎসক সংগঠন ?
নিজস্ব প্রতিবেদক,মানুষের মতামত:তৃণমূল কংগ্রেসের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন এক সংগঠন—প্রগ্রেসিভ হেলথ অ্যাসোসিয়েশন। সাম্প্রতিক কলকাতা প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই সংগঠনের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের কথা জানালেন রাজ্যের বাণিজ্যমন্ত্রী ও পেশায় চিকিৎসক শশী পাঁজা।তিনি জানিয়েছেন,চিকিৎসক,নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বার্থরক্ষা এবং মানুষের পরিষেবা দেওয়ার লক্ষ্যে এই সংগঠন গঠিত হয়েছে।তবে এই নতুন সংগঠনের পেছনে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও আরজিকর আন্দোলনের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
নতুন সংগঠন তৈরির প্রেক্ষাপট
২০২৩ সালে আরজিকর মেডিক্যাল কলেজে যুবতী চিকিৎসকের ধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় চিকিৎসকদের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলন রাজ্য সরকারের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।আন্দোলনের সময় রাজ্যের চিকিৎসা পরিষেবা কার্যত ভেঙে পড়ে। এই সময়ে তৃণমূলের চিকিৎসক সংগঠন “প্রগ্রেসিভ ডাক্তার অ্যাসোসিয়েশন”-এর নেতাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।বিশেষত,তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ শান্তনু সেন ও বিধায়ক সুদীপ্ত রায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব সেই সময় তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়।এই প্রেক্ষাপটে তৃণমূল সরকার স্বাস্থ্য খাতে দলের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের জন্য নতুন একটি সংগঠন গড়ার প্রয়োজন অনুভব করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রগ্রেসিভ হেলথ অ্যাসোসিয়েশন নামের এই নতুন সংগঠনের নেতৃত্বে আনা হয়েছে শশী পাঁজাকে,যিনি দলের অভ্যন্তরে শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ নেতা হিসেবে পরিচিত।
সংগঠনের লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সংগঠনের সভানেত্রী শশী পাঁজা জানিয়েছেন, “আমাদের লক্ষ্য মানুষকে পরিষেবা দেওয়া।এই সংগঠন সেই দিকেই কাজ করবে।” তিনি আরও বলেন,রাজ্য এবং জেলা স্তরে সংগঠনের ভিত্তি গড়ে তোলা হবে এবং রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর সদস্যদের ভূমিকা স্পষ্ট করা হবে।তবে পুরনো চিকিৎসক সংগঠনের নেতাদের নতুন সংগঠনে জায়গা দেওয়া হবে কিনা,তা নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি শশী।তিনি বলেন,“সংগঠনে নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” এই বক্তব্যে কার্যত পুরনো নেতাদের প্রতি অস্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে।
আরজিকর আন্দোলনের ছায়া
আরজিকর মেডিক্যাল কলেজের আন্দোলন তৃণমূলের চিকিৎসক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলিকে প্রকাশ্যে এনেছিল।আন্দোলনের সময় চিকিৎসকদের একাংশ তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরব হন। এর পাশাপাশি,শান্তনু সেন ও সুদীপ্ত রায়ের দ্বন্দ্বে চিকিৎসক সংগঠনের নেতৃত্বে বিভাজন স্পষ্ট হয়।শশী পাঁজা সাংবাদিক বৈঠকে এই দ্বন্দ্ব নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও তার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব চিকিৎসক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলি মেটানোর জন্য নতুন উদ্যোগ নিয়েছে।
চিকিৎসক মহলের প্রতিক্রিয়া
কলকাতার চিকিৎসক মহলের মতে,নতুন সংগঠনের লক্ষ্য যতই সেবামূলক হোক, এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে। তৃণমূলের চিকিৎসক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জর্জরিত।নতুন সংগঠনের মাধ্যমে দল অভ্যন্তরীণ সংকট মেটাতে এবং আন্দোলন মোকাবিলায় নতুন সমাধান খুঁজছে। তবে, পুরনো সংগঠনের সদস্যদের নতুন সংগঠনে স্থান দেওয়া হবে কিনা তা নিয়ে শশীর বক্তব্যে স্পষ্টতা না থাকায় সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। চিকিৎসক মহলের মতে,এই সিদ্ধান্ত দলীয় নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ অবস্থানকে আরও ঘোলাটে করবে।
নতুন সংগঠনের চ্যালেঞ্জ
নতুন সংগঠন প্রগ্রেসিভ হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে তৃণমূল চিকিৎসা পরিষেবার উন্নতি এবং দলের ভাবমূর্তি ফেরানোর চেষ্টা করছে। তবে, পুরনো সংগঠনের নেতৃত্বের অসন্তোষ, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, এবং চিকিৎসকদের আন্দোলন সামলানো—এই তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ থাকবে শশী পাঁজার নেতৃত্বাধীন সংগঠনের সামনে।এই সংগঠন কার্যত তৃণমূলের চিকিৎসক সমাজের একতার প্রতীক হতে পারবে কিনা, তা সময়ই বলবে। তবে শাসক দলের অভ্যন্তরে নতুন সংগঠন তৈরি যে পুরনো দ্বন্দ্বের সমাধান নয়,বরং তা আরও গভীর করার ঝুঁকি তৈরি করেছে, তা বলাই যায়।