ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল:সংস্কার না হস্তক্ষেপ?
মো:ইমরান ওয়াহাব, আইপিএস,আইজি (প্রভিশনিং): পশ্চিমবঙ্গ ওয়াকফ মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ দান,আল্লাহর পথে উৎসর্গিত স্থায়ী সম্পত্তি। “একবার ওয়াকফ মানে চিরস্থায়ী ওয়াকফ” নীতিতে এটি কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে নতুন ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল, নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এই আলোচনায় বিলের মূল বিষয় ও এর আইনি,সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাব সহজভাবে তুলে ধরা হবে।
এই বিলের ৩সি (১) ধারা অনুসারে, সরকারি সম্পত্তি ওয়াকফ হিসেবে গণ্য হবে না, যা আগে চিহ্নিত হলেও। ফলে সরকারি জমিতে থাকা মসজিদ-মাদ্রাসার ওয়াকফ মর্যাদা কমবে এবং আইনি জটিলতা বাড়বে। “ব্যবহারের মাধ্যমে ওয়াকফ” বাতিল হওয়ায় পুরনো কাগজপত্রবিহীন ওয়াকফের মালিকানা সমস্যা তৈরি হতে পারে ও দানকার্য ব্যাহত হতে পারে।
ওয়াকফ ট্রাইব্যুনাল যে রায় দেয়,তার বিরুদ্ধে চাইলে উপরের আদালতে,মানে হাইকোর্টেও যাওয়া যায়। এমনকি দরকার হলে সুপ্রিম কোর্টেও যাওয়া যেতে পারে। তবে,এমন একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা যায় না।
নতুন আইনে এক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।পূর্বে ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালে মুসলিম আইন সম্পর্কে জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরা থাকতেন,কিন্তু এখন সরকার তাদের পরিবর্তে সরকারি চাকুরিজীবীদের নিয়োগের কথা বলছে।এর ফলে ওয়াকফের ধর্মীয় ও জটিল বিষয়গুলো সঠিকভাবে উপলব্ধি করা নাও যেতে পারে।
এই নতুন আইন ওয়াকফের চিরস্থায়ীত্বের নীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, কারণ অনেক ওয়াকফ সম্পত্তিকে আর ওয়াকফ হিসেবে গণ্য না করার সুযোগ সৃষ্টি হবে,যা ইসলামিক আইনের বিরোধী। এর ফলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা নষ্ট হতে পারে,আইনি ঝামেলা ও মানুষের বিশ্বাস কমতে পারে এবং ধর্ম ও দানের ভিত্তিতে তৈরি দীর্ঘদিনের ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়ে সমাজে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
এই বিলের সামাজিক প্রভাব গভীর উদ্বেগের কারণ। মসজিদ,মাদ্রাসা,মাজার ও কবরস্থানের মতো ওয়াকফ সম্পত্তিগুলো কেবল ধর্মীয় স্থান নয়, এগুলো সমাজের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকার এগুলো অধিগ্রহণ করলে সমাজে অস্থিরতা ও অবিচারের অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে। অনেক ওয়াকফ সম্পত্তি দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো জরুরি সেবা প্রদান করে,এগুলো বন্ধ হলে বৈষম্য আরও বাড়বে এবং সামাজিক বন্ধন দুর্বল হবে। উপরন্তু,এই বিল সরকার ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ করতে পারে, কারণ এটিকে ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হতে পারে,যা উত্তেজনা ও অবিশ্বাস জন্ম দেবে।
এই বিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ভারসাম্যে বড় উদ্বেগ সৃষ্টি করে। সরকারের জমি ব্যবহারের অধিকার থাকলেও,ওয়াকফ সম্পত্তির ক্ষেত্রে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অধিকারের সম্মান জানানো জরুরি। ওয়াকফ কেড়ে নিলে জনকল্যাণ কমবে ও দানের আগ্রহে ভাটা পড়বে। মসজিদ-কবরস্থানের মতো পবিত্র স্থানকে সরকারি সম্পত্তি বললে ধর্মীয় সম্প্রদায় আঘাত পাবে ও দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। জেলা কালেক্টরদের ক্ষমতা দেওয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ভয় আছে। ওয়াকফ বোর্ডে অমুসলিম সদস্য রাখায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে,কেউ স্বচ্ছতা আশা করছেন, আবার কেউ ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসন নিয়ে চিন্তিত, এবং একই নিয়ম অন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও লাগু হবে কিনা সেই প্রশ্ন উঠছে।
এই বিল ওয়াকফের স্থায়ীত্ব ও নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করেছে। এর ফলে বহু ওয়াকফ সম্পত্তি বিতর্কের মুখে পড়তে পারে এবং ইসলাম ধর্মের প্রধান নীতির সাথে সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে। এটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থিরতা নষ্ট করতে পারে,ধর্মীয় স্বাধীনতায় বাধা দিতে পারে এবং সরকারের উপর জনগণের আস্থা কমাতে পারে।
অতএব,এই বিল নিয়ে সংবেদনশীলতা,আন্তরিকতা ও সংবিধান অনুযায়ী সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি,যাতে ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় থাকে এবং জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক শান্তি অক্ষুণ্ণ থাকে।
আমার আশা,ওয়াকফ সংশোধনী বিলটি গণতান্ত্রিক উপায়ে শান্তিপূর্ণভাবে অথবা ভারতের সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে প্রত্যাহার করা হবে। আমরা জানি যে কৃষক বিলটি এর আগে গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
এই বিলের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে চারটি পৃথক আবেদন দাখিল করা হয়েছে। কংগ্রেস সাংসদ মহম্মদ জাভেদ, এআইএমআইএম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এবং এএপি বিধায়ক আমানতুল্লাহ খান বিলটিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তারা ছাড়াও, ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য প্রোটেকশন ইন দ্য ম্যাটার অফ সিভিল রাইটস’ও সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন দাখিল করেছে।
আমাদের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য নির্বাহী,আইনসভা ও বিচারব্যবস্থার উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। একবার বিল সংসদে পাস হয়ে গেলে, সুপ্রিম কোর্ট সরাসরি তা বাতিল করতে পারে না। তবে বিলের কোনও নির্দিষ্ট ধারা সংবিধান বিরোধী হলে,আদালত তা পর্যালোচনা করে আইনসভাকে পরামর্শ দিতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে যেহেতু বাস্তবায়ন ও আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জেলাশাসকের ক্ষমতা বৃদ্ধি ও অমুসলিম প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছে,সেহেতু সুপ্রিম কোর্ট বিলটির সাংবিধানিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।কোনও বিধান মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রমাণিত হয়, তবে আদালত সংসদকে তা সংশোধনের পরামর্শ দিতে পারে।
(লেখক পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ মহাপরিদর্শক। উক্ত মতামত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত।)