NewsPolitics

রাম নবমীকে সামনে রেখে উত্তপ্ত বঙ্গ রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক,মানুষের মতামত:রবিবার দেশজুড়ে পালিত হবে রামনবমী। এই উৎসবের আগে থেকেই পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। একদিকে, ধর্মীয় উৎসবের আবহ, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অবস্থান রাজ্যের পরিস্থিতিকে আরও উষ্ণ করে তুলেছে। ইতিমধ্যে কলকাতা শহরজুড়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ছবি দেওয়া রামনবমীর হোর্ডিং ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের একাংশের আশঙ্কা, রামনবমী উপলক্ষে অশান্তির সৃষ্টি হতে পারে,যা গত বছরের হাওড়া ও হুগলির ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।

প্রশাসনের সতর্ক বার্তা

রাজ্য সরকার ও পুলিশ প্রশাসন অতীতের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে আগে থেকেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। গত বছর হাওড়ার শিবপুর এবং হুগলির রিষড়ায় রামনবমীর মিছিলকে কেন্দ্র করে অশান্তির ঘটনা ঘটেছিল, যা এখনো প্রশাসনের স্মৃতিতে টাটকা। তাই এ বছর প্রশাসনের দুই উচ্চপদস্থ আইপিএস অফিসার, সুপ্রতিম সরকার এবং জাভেদ শামিম, সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার বার্তা দিয়েছেন। পুলিশের তরফ থেকে বলা হয়েছে, কেউ যাতে প্ররোচনায় পা না দেয় এবং আইন নিজের হাতে না নেয়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তা

রাজ্যে ইদের দিন রেড রোডে নামাজের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা দেন। তিনি বলেন, “লাল আর গেরুয়া এক হয়ে অশান্তি করছে। আমরা বিভাজনের রাজনীতি করি না। ধর্মের নামে ব্যবসা করে কিছু রাজনৈতিক দল। সব ধর্মের প্রতিই আমি সমান শ্রদ্ধাশীল। কেউ কেউ গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করছেন। প্ররোচনায় যেন কেউ পা না-দেয়। কেউ গোলমাল পাকাতে এলে মনে রাখবেন, দিদি আছে।” মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য বিজেপিকে নিশানা করেই করা হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই বিষয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি বলেছেন,“মৃত্যু পর্যন্ত একতা বজায় রাখতে হবে।সবাইকে মিলেমিশে থাকতে হবে।” তাঁর বক্তব্যও রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার উপর গুরুত্ব দিয়েছে।

বিজেপির পাল্টা অবস্থান

এদিকে, সোমবার ইদ উৎসবের দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ছবি দেওয়া হোর্ডিং পড়ল কলকাতা শহর জুড়ে। ওই পোস্টারের নিচে লেখা, ‘‌রামনবমী পালন করুন’‌। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার একটি ধর্মীয় সংগঠনের সৌজন্যে রামনবমীর ব‍্যানার দিয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছে কলকাতাকে। আর এই হোর্ডিং নিয়েই এখন তুমুল বিতর্ক দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলনেতার ছবি দিয়ে কেন এমন পোস্টার পড়ল?‌ উঠছে প্রশ্ন।

বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ রামনবমী উপলক্ষে অস্ত্রসহ মিছিলের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, মহরমে যদি অস্ত্রসহ মিছিল হতে পারে,তবে রামনবমীতেও তা হওয়া উচিত। তিনি বলেন, “আমাদের সব দেব-দেবীদের হাতে অস্ত্র রয়েছে। মিছিলের সুরক্ষার জন্যই অস্ত্র নিয়ে বেরনোর দরকার আছে কারণ পুলিশের ওপর ভরসা নেই।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, পুলিশের নিজেদেরই সুরক্ষা নেই, তারা কীভাবে অন্যদের সুরক্ষা দেবে। বিজেপির এই অবস্থানের ফলে রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। দিলীপ ঘোষের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ থেকে বলা হয়েছে, এটি সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরির একটি প্রচেষ্টা।

রামনবমীর আগে সতর্ক প্রশাসন

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসন বেশ কিছু কড়া ব্যবস্থা নিতে চলেছে। বিভিন্ন জেলায় অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। হাওড়া, হুগলি, কলকাতা-সহ সংবেদনশীল এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকেও সক্রিয় করা হয়েছে, যাতে অশান্তির কোনো সম্ভাবনা থাকলে তা আগেই প্রতিহত করা যায়।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে,সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলার অন্যতম পরিচয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রামনবমী ও মহরমের মতো ধর্মীয় উৎসবগুলিকে কেন্দ্র করে রাজনীতির মেরুকরণ বাড়ছে। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস সম্প্রীতির বার্তা দিচ্ছে,অন্যদিকে বিজেপি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে সামনে রেখে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।

রামনবমীকে কেন্দ্র করে রাজ্যে যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ,সবাই চাইছেন উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হোক। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, পাল্টা বক্তব্য, এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি বাংলার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকেই নতুন প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। প্রশাসনের দায়িত্ব থাকবে যাতে কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে না পড়ে এবং উৎসবগুলি শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়।

Share with

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *