সংঘ পরিবারের আগ্রাসনের রাজনীতি
দিলীপ চট্টোপাধ্যায়,মানুষের মতামত:পূর্বতন জনসংঘ,অধুনা বিজেপির মাদার উইং আরএসএসের বর্দ্ধমানে ভাগবতের সমাবেশে এবার স্বয়ংসেবক পরিবারের আগ্রাসনের মনোভাবই ফুটে উঠেছে।হিন্দুত্ব ও হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় রাষ্ট্রগঠনের লক্ষ্যে সংঘ পরিবার সামগ্রিক আগ্রাসী মনোভাব চার্চ ও মিশনারিদের উপর ব্যয় করতে পিছপা হয়নি। কৌশলগত কারণেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে আগ্রাসী মনোভাব না দেখিয়ে তা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। চার্চ সংগঠন ও তাদের বিদেশী ভারতীয় মদত-দাতাদের উপর। স্বয়ং সেবক রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে আরএসএস মারাঠী উচ্চবর্ণ ও ব্রাহ্মণদের নিয়ন্ত্রিত ছিল। এই ধারা হেগড়েওয়াড়কর, গোলওয়ালকর ও দেওরস পর্যন্ত অটুট ছিল। রাজুভাইয়া আরএসএস প্রধান হলেন সংগটন ও রাজনীতির বিচারে গোবলয়ের উচ্চবর্ণের প্রভাব প্রশ্নাতীত।দক্ষিণ ভারতে আরএসএসের রাজনৈতিক শাখা বিজেপির প্রভাব বাড়াতে গোবিন্দাচার্য, ভেংকাইয়া নাইডু, রাজাগোপাল,জনা কৃষ্ণমূর্ত্তি প্রমুখ দাপুটে নেতৃত্বের আবির্ভাব হয়েছে। শিষাদ্রি, সুদর্শনের সাংগঠনিক প্রভাব শুধু আরএসএসেই নয়, তার প্রভাব বিজেপি শাখা সংগঠনের প্রতি অপরিসীম হয়ে ওঠে।
সংঘের প্রস্তাব ও লাইনের পেছনে মূলত: ভাগবতের চিন্তাই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে বিজেপির সঙ্গে তার মাদার সংগঠন আরএসএসের বিভিন্ন ইস্যুতে তীব্রতম মতপার্থক্য গড়ে উঠেছে।খৃষ্টান মিশনারীদের ধর্মান্তর প্রয়াসের বিরুদ্ধে আরএসএসের আগ্রাসী প্রতিহত মূলক কর্মসূচীতে অতীত অটলপন্থীদের সায় ছিল না। মদনলাল খুরানা সুন্দরলাল পাটোয়া, প্রমোদ মহাজন প্রমুখ অটলপন্থীরা খৃষ্টান নিগ্রহের ঘটনা,বিজেপির পিছিয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে আরএসএসের ভূমিকায় যথেষ্ট ক্ষুব্ধ ছিলেন। এমনকি সংঘ পরিবারের সর্বোচ্চ নেতা রাজেন্দ্র সিং বিজেপি জোট
সরকারের আর্থিক উদারিকরণ নীতি,পেটেন্ট ও ইনস্যুরেন্স বিলের ব্যাপারে নরম মনোভাব গ্রহনে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু সুদর্শন, দত্তপন্থ ঠেংড়ি,এস.গুরুমূর্তি প্রমুখরা ছিলেন এর ঘোরতর বিরোধী। মোদীর আমলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। আরএসএস দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যায় প্রকট সঙ্গে ধর্মান্ত ও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আগ্রাসী হিন্দু রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে চান। সংঘ পরিবারের ধারণা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নাগাল্যাণ্ড, মেঘালয়, মিজোরাম, মণিপুর, ত্রিপুরা ও আসামের একাংশকে নিয়ে পৃথক খৃষ্টানল্যাণ্ড গড়ার জন্য বিদেশী শক্তি সক্রিয়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আগ্রাসী হিন্দুত্বের রাজনীতির মধ্যে একটা ধর্মান্ত, বাংলাদেশী মুসলিম অনুপ্রবেশ ঠেকানো সহজ হয়ে যাবে। সংঘ পরিবার চান, চার্চের করতে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলি এবং বিহার, বাংলা, উড়িষ্যায় স্বদেশী জাগরণ যজ্ঞের কাজকর্মের পরিধি বিস্তার করা। আর এস এসের জাতীয় নেতারা বৈঠকে উত্তর-পূর্বে ধর্মান্তরের লক্ষ্যে বিদেশী শক্তিগুলির মনোভাব কঠোরভাবে মোকাবিলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বোড়োল্যাণ্ড, টি এন এল এফ, এন এস সি প্রভৃতি বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলিকে নানাভাবে প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ মদত যোগাচ্ছে চার্চ সংস্থাগুলি। আর এস এস নেতৃত্ব ঠিক করেছেন উত্তর-পূর্বের মানুষদের জাতীয় স্রোত ধারায় ফেরাতে চার্চের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ ও হিন্দুত্ব পুনরুজ্জীবনের সংগ্রামকে জোরদার করা হবে। উত্তর-পূর্বে বিদেশী মিশনারীরা খৃষ্টানরাষ্ট্র গড়তে চান এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যাচ্ছে সি. পি. এম পলিটব্যুরো সদস্য ও ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার ১৯৯৭ সালের দেশহিতৈষী পত্রিকার শারদ সংখ্যায় আর এস মদতের অভিযোগ তুলেছিলেন। পরে তার থেকে সরেন মানিক সরকার।
সংঘ পরিবার ও তাঁদের শাখা সংগঠন নতুন করে হিন্দু জাতীয়তাবাদের আগ্রাসনের রাজনীতি শুরু করবেন বলেই পর্যবেক্ষক গ্রহণ মনে করছেন। আর এস এসের আগ্রাসী মনোভাবের পেছনে ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির মুসলিম মৌলবাদ, চার্চ সংস্থাগুলির জাতীয়তা, রাষ্ট্র বিরোধী কাজকর্মের ব্যাপারে নিস্কৃয়তা কাজ করছে। ধর্মনিরপেক্ষরা যদি মুসলিম মৌলবাদের আগ্রাসী কাজকর্ম, চার্চের ধর্মান্তরের কর্মসূচির বিরোধিতায় মুখর হতেন তাহলে সংঘ পরিবার হিন্দু পূণরুজ্জীবনবাদের তাস খেলার সুযোগ পেতেন বলে মনে হয় না। সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে সার্বিক লড়াইয়ের বদলে ধর্মনিরপেক্ষরা শুধু হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার ব্যাপারেই মুখর হতে চান। সংঘ পরিবার চার্চ, খৃষ্টান বিরোধী মানসিকতার রাজনৈতিক লক্ষ্য অবশ্যই ক্যাথলিক খৃষ্টান মহিলা সোনিয়া গান্ধী। সংঘ পরিবারের আশংকা সোনিয়া গান্ধী রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করলে দেশে খৃষ্টানদের তৎপরতা বাড়বে। বিদেশী মদতে অনগ্রসর শ্রেণীকে ধর্মান্তর করে খৃষ্টান করার প্রয়াস হবে। তাই সংঘ পরিবারের আগ্রাসনের রাজনীতি ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন সমস্যা তৈরি করবে।