পদ্মশ্রী বঞ্চনায় ক্ষুব্ধ কিশোর কুমার অনুরাগীরা:কেন উপেক্ষিত ‘গুরুদেব’?
স্টাফ রিপোর্টার,মানুষের মতামত:২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি, ভারত সরকারের ঘোষিত পদ্মশ্রী পুরস্কারের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন একাধিক গায়ক, গায়িকা, এবং সঙ্গীতশিল্পী। কিন্তু তালিকাটি প্রকাশের পর থেকেই শুরু হয়েছে বিতর্ক, কারণ সেখানে নেই সেই নাম, যা ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা—কিশোর কুমার। কিংবদন্তি এই শিল্পী মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পেরিয়েও ভারত সরকারের শীর্ষ বেসামরিক সম্মান থেকে বঞ্চিত। আর এই উপেক্ষা মেনে নিতে পারছেন না তাঁর অগণিত অনুরাগী ও সঙ্গীতপ্রেমীরা।
কিশোর কুমার: এক বহুমাত্রিক প্রতিভা
কিশোর কুমার শুধু একজন গায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন সঙ্গীত পরিচালক, অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক, এমনকি চিত্রনাট্যকারও। ১৯২৯ সালে মধ্যপ্রদেশের খাণ্ডোয়ায় জন্ম নেওয়া কিশোর কুমার (আসল নাম অভাষ কুমার গাঙ্গুলি) ১৯৪০-এর দশকের শেষ দিকে বলিউডে পা রাখেন। তারপরের গল্পটা শুধুই ইতিহাস। তাঁর সুরেলা কণ্ঠ, গানের বৈচিত্র্য, কৌতুকপ্রিয়তা, এবং অভিনয়ের অসামান্য দক্ষতায় তিনি হয়ে ওঠেন এক বহুমাত্রিক শিল্পী।
‘রূপ তেরা মস্তানা’, ‘মেরে সাপনো কি রানি’, ‘ইয়ে শাম মস্তানি’, ‘কোরা কাগজ থা ইয়ে মন মেরা’—এমন হাজারো গান আজও শোনার পর মনে হয় যেন নতুন। তাঁর গান শুধুমাত্র বিনোদন নয়, একটি প্রজন্মের আবেগ ও স্মৃতির অংশ। এমন এক শিল্পী, যাঁর অবদান ভারতীয় সঙ্গীতকে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও পরিচিত করেছে, কেন তিনি আজও পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, বা পদ্মবিভূষণ-এর মতো সম্মান থেকে বঞ্চিত—এই প্রশ্ন উঠছে সর্বত্র।
উপেক্ষার কারণ কী?
কিশোর কুমারের বঞ্চনার কারণ হিসেবে নানা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। অনেকের মতে, তিনি সরকারি পুরস্কারের প্রতি কখনওই আগ্রহ দেখাননি। তাঁর স্পষ্টবাদিতা এবং নিয়মের প্রতি বিদ্রোহী মনোভাব হয়তো তাঁকে এই জাতীয় সম্মান থেকে দূরে রেখেছে। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময় সরকারের একাধিক নির্দেশ মানতে অস্বীকার করেছিলেন কিশোর, যা তৎকালীন শাসকদের বিরাগভাজন করেছিল তাঁকে।
তবে প্রশ্ন উঠছে—একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত মনোভাব কি তাঁর শিল্পীসত্তাকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অন্তরায় হতে পারে? তাঁর গান, সৃষ্টিশীলতা, এবং সাংস্কৃতিক অবদান কি এমন অবহেলার যোগ্য?
অনুরাগীদের ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া
কিশোর কুমারের পদ্মশ্রী বঞ্চনা নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে সারা দেশের অনুরাগীরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় #JusticeForKishore ট্রেন্ড করছে, যেখানে লক্ষাধিক মানুষ তাঁদের হতাশা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, “যাঁর কণ্ঠ ছাড়া ভারতের সঙ্গীতজগৎ অসম্পূর্ণ, তাঁকে এইভাবে উপেক্ষা করা জাতীয় অসম্মান।”
সঙ্গীত জগতের অনেকে সরাসরি সরকারের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন—“কোন মানদণ্ডে কিশোর কুমার যোগ্য নন?” কিংবদন্তি সঙ্গীত পরিচালক ও গায়করাও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “কিশোর কুমার কোনো পুরস্কারের জন্য নয়, কিন্তু একটি জাতি হিসেবে আমাদের তাঁর প্রতি সম্মান দেখানো উচিত।”
পুরস্কার পেতে না পেতেই কিশোর কুমারের মহানতা কমে যায় না। তবে জাতীয়ভাবে এমন একজন কিংবদন্তি শিল্পীর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একটি প্রজন্মের স্মৃতি, সংস্কৃতি, এবং ইতিহাসকে সন্মান জানানো। ভারত সরকারের কি এখন সময় নয় এই অবিচার সংশোধন করার? সঙ্গীতপ্রেমীদের একটাই প্রশ্ন “কবে মিলবে কিশোর কুমারের প্রাপ্য সম্মান?”