দ্রুত ঘটতে চলেছে সাংগঠনিক রদবদলের জল্পনা:মমতা-অভিষেকের নতুন কৌশলের ইঙ্গিত
নিবারণ চক্রবর্তী,মানুষের মতামত:২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরমহলে সাংগঠনিক রদবদলের জল্পনা তীব্র হয়েছে। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরামর্শে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি বড়সড় পরিবর্তনের পথে হাঁটবেন? এই প্রশ্নেই সরগরম তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ মহল। কারণ ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর লোকসভা ভোটেও অভিষেকের কৌশলে বাজিমাৎ করেছে তৃণমূল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বিশাল জয় পেলেও, সাম্প্রতিক নির্বাচনে কিছু এলাকায় বিজেপির প্রভাব বেড়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে । এছাড়াও, দলের কিছু নেতা ও জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঘটনা দলের ভাবমূর্তিকে আঘাত করেছে। আরজি কর-কাণ্ডের পর তৃণমূলের ভাবমূর্তি রাজ্যের মানুষের কাছে কলুষিত হয়েছে। ফলে সাংগঠনিক রদবদল অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে বলেই মনে করছে দলের একাংশ নেতারা।
তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, বিধানসভা নির্বাচনের আগে দলের মধ্যে একতা বজায় রাখা এবং কর্মীদের মধ্যে উজ্জীবন ফিরিয়ে আনার জন্য সাংগঠনিক পরিবর্তন জরুরি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই একাধিক বৈঠকে এই বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের সাংগঠনিক রদবদল একাধিক স্তরে হতে পারে।
১. জেলা সভাপতিদের পরিবর্তন: কিছু জেলায় দুর্বল নেতৃত্বকে সরিয়ে নতুন ও তরুণ মুখদের জায়গা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষত যেখানে বিরোধীরা শক্তি বাড়িয়েছে, সেসব জেলায় নতুন নেতৃত্ব আনার সম্ভাবনা বেশি। ২. দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন মুখ: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় চাইছেন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে অভিজ্ঞ ও সৎ নেতাদের নিয়ে আসতে। ৩. তরুণ কর্মীদের অগ্রাধিকার: অভিষেকের নেতৃত্বে ‘তৃণমূল নবজাগরণ’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে তরুণদের মধ্যে থেকে নতুন নেতৃত্ব তৈরির কাজ চলছে। এতে দলের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই রদবদল নিয়ে দলের ভেতরে কিছুটা অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বহু সিনিয়র নেতা মনে করছেন যে, তরুণ প্রজন্মকে বেশি গুরুত্ব দিলে পুরনো নেতাদের অভিজ্ঞতা ও অবদানকে উপেক্ষা করা হবে। এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই ভারসাম্য বজায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যদিকে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে গেলে দলীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং মতবিরোধ বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তৃণমূলের অন্দরমহল থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পরিবর্তন বাস্তবায়নে কড়া পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। তৃণমূলের সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে ইতিমধ্যেই বিরোধী শিবিরে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিজেপি এবং বাম-কংগ্রেস জোট তৃণমূলের এই কৌশলকে “চাপের প্রতিক্রিয়া” হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। বিরোধীরা দাবি করছে, তৃণমূলের অন্দরেই বিশৃঙ্খলা রয়েছে এবং রদবদল সেই অস্থিরতার প্রতিফলন।
তৃণমূলের এই সম্ভাব্য সাংগঠনিক রদবদল মূলত ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে লক্ষ্য করে। তৃণমূল চাইছে মানুষের কাছে নতুন বার্তা দিতে এবং তাদের সমর্থন আরও মজবুত করতে। এছাড়াও, বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য দলের ভিত শক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই উত্তরবঙ্গের বেশিরভাগ জেলাতেই সাংগঠনিক রদবদল হবে মনে করা হচ্ছে। কোচবিহার ছাড়া উত্তরবঙ্গের সব আসনই পরাজিত হয়েছে তৃণমূল। তাই উত্তরবঙ্গের বেশকিছু জেলার সভাপতি পরিবর্তন হতে পারে। যেমন উত্তর দিনাজপুর জেলা তৃণমূলের সভাপতি কানাইয়া লাল আগারওয়ালকে সরিয়ে কৃষ্ণ কল্যানীকে সভাপতি করা হতে পারে। তৃণমূল সূত্রে খবর, দার্জিলিং লোকসভা আসনের জিততে না পারার কারণ হিসেবে গৌতম দেবকে শিলিগুড়ির নেওয়ার পর থেকে সরানোর ভাবনাচিন্তাও শুরু হয়েছিল। তবে এ এই যাত্রায় তার পথ যাচ্ছে না বলেই মনে করা হচ্ছে। আলিপুরদুয়ার জেলা তৃণমূলের সভাপতি প্রকাশ বড়াইকেও সরানো হতে পারে। তৃণমূলের এক প্রবীণ নেতার কথায়, “অভিষেক মোর ৬০ থেকে ৬৫ জন ব্যক্তির রদবদলের কথা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে বলেছেন। কিন্তু আমরা যতদূর দিদিকে চিনি, বিধানসভা নির্বাচনের আগে এত বড় ঝুঁকি হয়তো তিনি নেবেন না। তাই উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে বেশ কিছু বদল হলেও দক্ষিণবঙ্গের জেলা সংগঠন এবং পুরসভাগুলিতে রদবদল নাও হতে পারে।”
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক রদবদল একদিকে দলকে আরও সংঘবদ্ধ করতে পারে, অন্যদিকে বিরোধীদের মোকাবিলায় নতুন কৌশল আনতে সাহায্য করবে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিকল্পনা ও মমতার অভিজ্ঞ নেতৃত্ব একত্রে তৃণমূলকে ২০২৬ সালের নির্বাচনে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। তবে এই রদবদল বাস্তবায়নের পথ কতটা মসৃণ হবে, তা সময়ই বলবে।